ভোলার মেঘনায় জেলেদের জালে ইলিশ ॥ জেলে পাড়ায় আনন্দ
ভরা মৌসুমের শুরু থেকে উপকুলীয় জেলা ভোলার মেঘনা নদী ও সাগর বক্ষে ইলিশের আকাল থাকলেও গত দু’দিন ধরে জেলেদের জালে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ছে। এতে করে ঝিমিয়ে পড়া জেলেরা আবার স্বরব হয়েছে। তারা জাল-নৌকা নিয়ে নদীতে দল বেঁধে ইলিশ শীকারে মেতে উঠেছে। কিছুদিন আগেও যে মাছঘাটগুলোতে ছিল নিরবতা, এখন সে মাছঘাটগুলোতে দেদারছে চলছে ইলিশ বিক্রির হাক ডাক। ইতি মধ্যেই খবর পেয়ে ইলিশ কিনতে ভোলায় পাড়ি জমিয়েছে রাজধানী ঢাকা, বন্দর নগড়ী চট্রগ্রাম, চাঁদপুর ও বরিশালসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পাইকারের দল। ভোলার হাট-বাজারগুলোতেও ইলিশের ছড়াছড়ি, আকার বড় কিন্তু দাম কম। অন্যদিকে, বেশি ইলিশ ধরা পড়ায় একদিকে জেলে পাড়ায় বইছে আনন্দের জোয়ার অন্য দিকে বাড়ছে জলদস্যু আতঙ্ক।
৩১জুলাই মঙ্গলবার সরেজমিনে ভোলার মেঘনা তীরবর্তী কোড়ারহাট, তুলাতলী, ভোলাখাল, নাছিরমাঝিসহ বিভিন্ন মাছঘাট ঘুড়ে দেখা গেছে ইলিশ শীকারি জেলেরা ইলিশ ধরে এনে ঝুড়িতে ঝুড়িতে স্তুপ করে রেখেছে। পাইকার, আড়ৎদার ও দাদনদারসহ সকলেই হুমড়ি খেয়ে মাছ কেনা-বেচায় ব্যস্ত সময় পাড় করছেন। কিছু সময় পড় পড়ই ঘাটে মাছ বোঝাই নৌকা আসছে। আবার উত্তাল ঢেউ ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দলে দলে মাঝিরা নৌকা-ট্রলার নিয়ে মাছ শীকারে পাড়ি জমাচ্ছে নদী ও সাগড় বক্ষে। সকলের মনেই আনন্দের ছোঁয়া লেগেছে। জালে উঠছে বড় ইলিশ। অধিকাংশ ইলিশ ১কেজি থেকে দেড় কেজি ওজনের। দামও তুলনা মূলক কম। মাছঘাটগুলোতে হালি হিসেবে মাছ ডাকে বিক্রি হচ্ছে। হালি প্রতি মাছের দাম পড়ছে দু’হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা করে। এসময় কথা হয় ভোলাখাল মাছঘাটের শুক্কুর মাঝির সাথে। তিনি বলেন, আল্লায় আমাগো দিগে মুখ তুইল্লা চাইছে মিয়াভাই। এইরম যদি আর কয়সপ্তা মাছ জালে ধরা পড়ে তাইলে এইবারকার সব লোসকান মিডাইয়া লাভের মুখ দেকতারুম। কোড়ারহাট মাছঘাটে গিয়ে কথা হয় আড়ৎদার রিপন হাওলাদারের সাথে। তিনি বলেন, মেঘনায় জাইল্যাগো পিছে লক্ষ লক্ষ টাকা লাগাইয়া থুইছি। নদিত মাছ না থাওনে আমার দাদনের মাছ দিতে পারেনাই। এহন মাছ পরতাছে। হেরলাইগ্যা গাডে বইয়া রইছি। মাছ আইলেই আড়দে লইয়া যাই। দাম-দুস্তর শেষে মোকামে পাডাই। তিনি আরো বলেন, গত কয়েক দিনে তিনি ঢাকার কাপ্তান বাজারে কমপক্ষে ৫ লাখ টাকার ইলিশ পাঠিয়েছেণ। গত কয়েক দিনের তুলনায় এখন ইলিশের দাম কম বলেও জানান তিনি।
ভোলার বিচ্ছিন্ন সাগর মোহনার দ্বীপ মনপুরার মাছ ব্যাবসায়ী জুয়েল মিয়া জানান, সেখানকার রাম নেওয়াজ, কাটাখাল, হাজির হাট, লতাখালী, তালতলা, রিজিরখাল, বেয়াইজ্যাখাল, কলাতলি, মাষ্টার হাট, খালগোড়া, সূর্যমুখি ও চরনিজামসহ প্রায় ২’শতাধিক মাটঘাট হতে ভরা মৌসুমে প্রতিদিন কমপক্ষে ৫কোটি টাকার ইলিশ ঢাকার শোয়ারী ঘাটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি হয়ে থাকে। তিনি আরো জানান, গত কয়েক দিন ধরে ঝড়-বৃষ্টি ও বাতাসে নদী ও সাগড়ে ইলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে জেলেদের জালেও মাছ ধরা পড়ছে বেশি। একারনে এখানকার আড়ৎগুলোতে ইলিশ বেচা-কেনার ধুম লেগেছে।
মঙ্গলবার ভোলা সদরের মাছবাজারে গিয়েও দেখা গেছে একই দৃশ্য। বাজারের অধিকাংশ মাছ বিক্রেতার ঝুড়িতে সারি সারি বড় ইলিশের সমাহার। দামও তুলনামুলক কম। তাই ক্রেতারাও নাগালের মধ্যে পেয়ে ইলিশ কিনছেন ধুমছে। সেখানকার মাছ বিক্রেতা মোঃ ইদ্রিছ বলেন, জাইল্যাগো জালে এহন বেশি ইলিশ পড়তাছে। তাই ইলিশ হস্তায় কিনন যাইতাছে। বেচতাছিও কমদামে। বাজারে আসা ক্রেতা শাহে আলম বলেন, এক সপ্তাহ আগেও যে বাজারে ছোট ছোট ইলিশ কেনা সাধ্যের বাইরে ছিল, এখন সেই বাজারেই বড় ইলিশ কম দামে পেয়ে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাচ্ছি।
জেলে পাড়ায় আনন্দঃ এদিকে জালে বেশি মাছ পরায় জেলে পাড়ায় বইছে আনন্দের জোয়ার। গত কয়েক মাস ধরে যে সমস্ত জেলে পল্লিতে ছিল অভাব-অনটন আর দূর্ভোগের ঘনঘটা, সেখানে এখন কিছুটা হলেও ফিরে এসেছে স্বস্তি। গতকাল ভোলা সদরের মেঘনার বুকে জেগে ওঠা চর রামদেবপুর ও বড়াইপুর জেলে পল্লিতে গেলে কথা হয় সেখানকার বাসিন্দাদের সাথে। তাদেরই একজন ছিডু মাঝি। তিনি বলেন, গত কয়েক মাসে বহু ধাড়-দেনা কইরা হালাইছি। নদীতে এমন মাছ পাইলে আমগো চিন্তা থাকবনা। দাদনদার ও মুদি দোহানের দেনা দিয়া দিতে পারুম। মাছ পড়লে দেনা শোধ, এইডাই আমাগো আনন্দ।
জলদস্যু আতংকঃ অপরদিকে, বেশি ইলিশ ধরাপড়লেই যে আনন্দ তাও নয়। ইলিশ বাড়ার সাথে সাথে বাড়ে জলদস্যু আতংক। জেলেরা নদী ও সাগর থেকে বুকভরা আশা নিয়ে মাছ ধরে ফেরার পথে অনেক সময়ই জলদস্যুদের কবলে পড়তে হয়। তখন মাছ, জাল, নৌকা এমকি জীবনও হারাতে হয় জেলেদের। দিতে হয় লাখ লাখ টাকা মুক্তিপন। ফলে জেলে পাড়াগুলোতে আনন্দের পাশাপাশি বইছে জলদস্যু আতংক। ভোলার মাঝের চরের জেলে পল্লীগুলোতে গিয়ে জেলেদের সাথে আলাপ করলে তাদের অনেকেই বলেন, নদীতে মাছ ধরতে নামলেই কোননা কোন বাহিনীর টোকেন নিয়ে নামতে হয়। তানাহলে নিশ্চিত বিপদ। নদীতে কোন বাহিনীর টোকেন নিয়া মাছ ধরুম, এমন কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারতাছিনা। টাকা দিয়া কার টোকেনে নির্ভয়ে মাছ ধরতে পারুম, আবার কার টোকেনে পারুমনা এমন দো-টানার মধ্যে আমরা রইছি। তারা আরো বলেন, এবার ইলিশের ভরা মৌসুমে হাতিয়ার স্বপন বাহিনী, কালাম ও তানসেদ বাহিনী, ভোলার দৌলতখানের আব্দুল হাই, জাবু, কামাল ও আলমগীর বাহিনী, ভোলা সদরের জামাল উদ্দিন সকেট বাহিনী ও চেয়ারম্যান বাহিনীসহ মেঘনা নদীতে জলদস্যুদের কমপক্ষে ১১টি বাহিনী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এরা জেলেদেরকে নিজ নিজ বাহিনীর বিভিন্ন রঙের টোকেন দিয়ে মাছ ধরার অনুমতি দিলেই নদীতে নামার সাহস করে জেলেরা।
এব্যাপারে ভোলা জেলা পুলিশ সুপার বশির আহম্মেদ জানান, ভোলার উপকূলীয় এলাকায় জলদস্যু নির্মূলে আমরা মেঘনার চরাঞ্চল গুলোতে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছি। জলদস্যু দমনে ইতিমধ্যেই ৩টি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। আরও ৭টি পুলিশ ক্যাম্পের কার্যক্রম পরিচলনার জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে জেলেরা আরও বেশি নিরাপদে নদীতে মাছ শীকার করতে পারবে।
অচিন্ত্য মজুমদার, ভোলা
Share on Facebook






























