হলমার্ককাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে শিগগিরই মামলা করা হবে : অর্থমন্ত্রী
কেবল সোনালী বাংক নয়, হলমার্কের অর্থ কেলেঙ্কারি সঙ্গে আরো ‘অনেকে’ জড়িত উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, তাদের বিরুদ্ধে শিগগিরই মামলা করা হবে।
ওই ঘটনার পর বিভিন্ন মহলে অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি উঠলেও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেননি বলে জানিয়েছেন মুহিত।
চীন সফরে যাওয়ার আগে রোববার অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনায় মন্ত্রী বলেন, অনেকেই ‘দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা’ করছে, তাদের বিরুদ্ধে অতি দ্রুত মামলা করা হবে।
“হলমার্ক বিষয়ে যথেষ্ট তদন্ত হয়েছে। সোনালী ব্যাংকে ফাংশনাল অডিট হয়েছে যা দেশে প্রথম, তাতে অনেক ভাল কাজ হয়েছে। মামলা করাটা খুব বেশি জরুরি এবং দ্রুত মামলা করে সে অনুযায়ী কিছু ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।”
একইসঙ্গে টাকা উদ্ধারের ‘বিভিন্নমুখী’ উদ্যেগ নেয়া হবে বলেও মন্ত্রী জানান।
স¤প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক নিরীক্ষায় সোনালী ব্যাংক থেকে তিন হাজার ৬০৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা সরিয়ে ফেলার তথ্য বেরিয়ে আসে। এর মধ্যে হলমার্ক গ্রুপ একাই তুলে নেয় দুই হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি।
দুর্নীতি দমন কমিশন এ অভিযোগের তদন্ত করছে। সোনালী ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ইতোমধ্যে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। তবে এখনো কারো বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি।
ওই ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত মঙ্গলবার বলেন, ওই টাকা ‘এমন কিছু বেশি নয়’।
তার ওই বক্তব্যের পর জাতীয় সংসদেও সমালোচনার ঝড় উঠলে বৃহস্পতিবার নিজ বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি সংসদে বলেন, “আমার এই বক্তব্যের কারণে দুর্নীতি উৎসাহিত হতে পারে। আমি চাই না দুর্নীতি উৎসাহিত হোক। সে জন্য আমি আমার এই বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি এবং বক্তব্যটি প্রত্যাহার করছি।”
‘এক হাতে তালি বাজে না’
হলমার্কের অর্থ কেলেঙ্কারির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থ মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, “এক হাতে তালি বাজে না, সেখানে সকলের কিছু দোষ আছে। অতিকথন রয়েছে, যেটা আমিও করি। তবে একটা বিষয়ে আমাদের সাবধান হওয়া উচিৎ, যা জাতীয় স্বার্থে, ব্যাংকিং সেক্টরে ধস দেশের জন্য খুব ক্ষতিকর, যার ইমেডিয়েট অ্যাকশন হয় বিদেশে।”
মুহিত বলেন, হলমার্কের মতো এতো ‘ভয়াবহ’ একটি ব্যাপার অনেকের ‘দৃষ্টি এড়িয়ে’ যাওয়ায় তার সন্দেহ, অনেক লোক ওই কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত।
“শুধু সোনালী ব্যাংক বা শাখার লোক না, এখানে আরো জড়িত রয়েছে।”
এ ধরনের ঘটনার বিচার হওয়া জরুরি মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, “এসব তদন্ত করলে বের হয়। এখানে একটি ইমিডিয়েট অ্যাকশন অনেক সময় ভাল। তবে এর পর সাক্ষী সাবুদ পাওয়া যায় না। ১৯৯৬ সালের স্টক মার্কেট কেস এখনো সমাধান হয় নাই। তার কারণ হিসাবে জানতে পেরেছি, কেউ সাক্ষ্য দেয় না।…এর কারণ সামাজিক আচারণ, এর সঙ্গে ‘ওর’ পরিচয়, ‘এর’ আত্মীয়তা- তা তো স্বাভাবিক।”
তবে যারা সব ক্ষেত্রে ‘রাজনৈতিক প্রভাবের’ অভিযোগ করেন, তাদের সমালোচনায় মুহিত বলেন, “আমাদের অনেকেই বিশেষ করে যারা ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণে আছেন, তারা হাঁটতে-বসতে বলেন ‘পলিটিক্যাল ইনফ্লুয়েন্স’… এটি বোগাস। ভাল মন্দ সব জায়গায় রয়েছে। পলিটিক্যাল তো থাকবেই। ঢালাওভাবে আক্রমণ পছন্দ হয় না আমার কাছে।”
ফখরুলকে ‘এক হাত’
পদত্যাগের দাবি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, “আমার পদত্যাগের জন্য বহু জায়গা থেকে দাবি আসছে, আমি দেখছি এগুলো, এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেইনি।”
বিরোধী দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি তোলায় তার সমালোচনা করে মুহিত বলেন, “বাজারে তো এটাই দাবি, ফখরুল ইসলাম সাহেব আছেন, উনার বক্তব্য শুরু আর শেষ হয় এটা দিয়ে।”
“উনি প্রায়ই অসত্য বক্তব্য দেন। আমি উনাকে খুব বেশি চিনি না। একটু একটু পরিচয় আছে। কিন্তু আমি দেখি, উনার স্টাইলটা এ রকম- অসত্যটা উনি খুব ভাল করে সামনে তুলে ধরেন”, বলেন অর্থমন্ত্রী।
‘আক্রোশ’
অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনায় সব মহলে সমালোচনার মধ্যেও সরকার সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের মেয়াদ বাড়ালো কেন জানতে চাইলে মুহিত বলেন, “আমার ব্যাপারে সবাই আক্রোশে রয়েছে। তবে এক জন ফ্রড ধরা পড়লে আগে থেকে অবহিত হতে হবে। সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, এতো কঠোর ব্যবস্থা আগে নেয়া হয়নি।”
মুহিত বলেন, “সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যানও আমার মতো আগুনের ওপর রয়েছে। আগুন দেখে পালিয়ে গেলেই তো হয় না। তা নিবৃত্ত করার চেষ্টা করতে হয়।”
সরকারের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, আগের পরিচালনা পর্ষদ রাখা হয়েছে ‘কোরাম’ পূর্ণ করার জন্য, যাতে মামলাসহ যে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া যায়।
চীন থেকে ফিরে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করবেন বলে জানান তিনি।
পদ্মা সেতু প্রসঙ্গ
পদ্মা সেতুর বিষয়ে এখনো ‘আশাবাদী’ মুহিত সাংবদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, “আগামী ২১ তারিখ পর্যন্ত জাইকা ও এডিবি লাইফ লাইন দিয়েছে। হোপফুল, পদ্মা সেতুর বিষয়ে একটি সুষ্ঠ সমাধান হবে। তখন বলব।”
চীনে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরাম) সভার পাশাপাশি পদ্মা সেতুর অর্থায়ন জটিলতা নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকের চেষ্টা করবেন বলে ইতোমধ্যে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
১১ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর চীনের তিয়ানজিনে ফোরামের তিন দিনব্যাপী বার্ষিক সভায় যোগ দিতে রোববার রাতেই তিনি রওনা হচ্ছে।
বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা না হলে ‘বিকল্প পথ’ খুঁজে রাখা হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, “বিশ্ব ব্যাংকের সাথে মতৈক্য হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। এ মাসে বিভিন্ন প্রসেস শুরু হয়ে যাবে।”
দুর্নীতির অভিযোগ তুলে গত ২৯ জুন বিশ্ব ব্যাংক পদ্মা প্রকল্প থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিলে ২৯১ কোটি ডলারের বহু প্রতীক্ষিত এই সেতুর নির্মাণকাজ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
বিশ্ব ব্যাংককে ফেরাতে তাদের শর্ত পূরণে ইতোমধ্যে মন্ত্রী পদ থেকে সরে গেছেন সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন। সেতু বিভাগের সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকেও ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। সব শর্ত পূরণ করতে হলে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমানকেও সরে যেতে হবে।
মসিউর রহমান পদত্যাগ না করায় বিশ্ব ব্যাংকের বিষয়টি আটকে আছে কি না জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, “বিশ্ব ব্যাংক কারো পদত্যাগ চায়নি। তবে আবুল হোসেন পদত্যাগ করেছেন। বিশ্বব্যাংক চেয়েছিল তারা যাতে সম্পৃক্ত না থাকে- সেজন্য ছুটি, পদত্যাগ নয়।”
Share on Facebook





























