প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপে ‘সমাধান পায়নি’ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট

নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে বৃহস্পতিবার বিকালে ইসি যখন রাষ্ট্রপতির দপ্তরে, তখন সন্ধ্যায় গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাড়িতে শুরু হয় ব্যাপক আলোচিত এই বৈঠক।

সন্ধ্যা ৭টায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বৈঠক; এরপর চলে রুদ্ধদ্বার আলোচনা। দুই পক্ষের ৪৩ জন নেতার আলোচনার মধ্যেই চলে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আপ্যায়ন।

এই সংলাপে সারাদেশের মানুষের চোখ থাকার মধ্যে গণভবনের বাইরে অপেক্ষায় ছিলেন গণমাধ্যমকর্মীরা। রাত ১০টা ৪০ মিনিটে বৈঠক শেষে নেতারা বেরিয়ে আসার পর সাংবাদিকরা ছেঁকে ধরেন ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের।

গণভবন থেকে বেরিয়ে গাড়ি ওঠার সময় সাংবাদিকরা ঐক্যফ্রন্টের মূল উদ্যোক্তা কামালের কাছে জানতে চান- আলোচনা কেমন হয়েছে?

উত্তরে তিনি এক কথায় বলেন, “ভালো।” আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে কি না- এই প্রশ্নে তার উত্তর আসে, “ফলপ্রসূ হবে।”

ঠিক একই সময়ে জোটের সবচেয়ে বড় দল বিএনপির মহাসচিব ফখরুল গাড়িতে ওঠার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, “আমরা (আলোচনায়) সন্তুষ্ট নই।”

গণভবন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক দল জেএসডি, নাগরিক ঐক্য, গণফোরাম কিংবা জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার কোনো নেতা সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের জবাব দেননি।

সংলাপে অংশ নেওয়া বিএনপির নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস নিজ নিজ গাড়িতে উঠে চলে যান।

তবে বিএনপির মহাসচিব ফখরুল ও জমিরউদ্দিন সরকার গিয়ে উপস্থিত হন বেইলি রোডে কামাল হোসেনের বাড়িতে, সেখানে তিনি ফ্রন্টের সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেন।

বিপুল সংখ্যক সাংবাদিকের উপস্থিতিতে কিছু হৈ চৈয়ের মধ্যে সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই কামাল বলেন, সংলাপে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বিভিন্ন দলের নেতারা তাদের কথা তুলে ধরেছেন, জানিয়েছেন নানা অভিযোগও।

“সবার কথা শোনার পর প্রধানমন্ত্রী লম্বা বক্তৃতা দেন,” বলেন তিনি।

সাংবাদিকদের প্রশ্নে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান নেতা বলেন, “তবে বিশেষ সমাধান আমরা পাইনি।

“শুধু একটা ব্যাপারে, সভা-সমাবেশের ব্যাপারে উনি যেটা বললেন, একটা ভালো কথা বলেছেন।”

নির্বাচনের আগে বিএনপির সঙ্গে নিয়ে জোট গঠন করে যে সাত দফা তুলে ধরেন কামাল, তার মূল দাবি হল খালেদা জিয়াসহ সব রাজনৈতিক নেতাকে মুক্তি নিয়ে, সংসদ ভেঙে দিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। সেই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, ভোটের সময় বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে সেনা মোতায়েন ও সভা-সমাবেশে বাধা অপসারণের দাবিও তোলে ঐক্যফ্রন্ট।

সংলাপ শেষে সংবাদ সম্মেলনে কামালের আহ্বানে গণফোরামের কার্যকরি সভাপতি সুব্রত চৌধুরী এসব বিষয়ে তাদের আলোচনা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, “সংলাপের শুরুতে ড. কামাল হোসেন সূচনা বক্তব্য রেখেছেন। এরপর বিএনপি মহাসচিব ৭ দফা দাবি তুলে ধরেছেন।”

সভা-সমাবেশে বাধা অপসারণের আশ্বাস পাওয়ার কথা জানিয়ে সুব্রত চৌধুরী বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ঢাকাসহ সারাদেশে সভা-সমাবেশে কোনো বাধা থাকবে না। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে নির্দেশ দিয়েছেন।”

রাজনৈতিক মামলা থাকলে তার তালিকা প্রধানমন্ত্রী চেয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “উনি বলেছেন, তালিকা আপনারা দেন। আমি অবশ্যই বিবেচনা করব যাতে হয়রানি না হয়।”

উত্থাপিত দাবি-দাওয়া নিয়ে ভবিষ্যতে আলোচনার দ্বার খোলা রাখার প্রতিশ্রুতিও প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন বলে জানান সুব্রত।

খালেদা জিয়ার মুক্তির যে বিষয়টি বিএনপির সবার আগে আনছে, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কী বলেছেন- সাংবাদিকরা জানতে চান দলটির মহাসচিব ফখরুলের কাছে।

বিমর্ষমুখে থাকা বিএনপি মহাসচিব বলেন, “তিনি (প্রধানমন্ত্রী) সুনির্দিষ্ট কিছু বলেননি। তিনি বলেছেন, এ নিয়ে পরবর্তীতে আরও আলোচনা হতে পারে।”

বিরোধ সমাধানের আগে নির্বাচনে তফসিল ঘোষণা হবে কি না- প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমরা তফসিলের বিষয়ে বলেছি। উনি (প্রধানমন্ত্রী) বলেছেন, তফসিল দেওয়ার এখতিয়ার নাই। সেটা নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে।”

এর মধ্যে কামাল বলেন, “আমরা সংলাপের সুযোগ পেয়েছি। আমরা আমাদের কথা বলে এসেছি উনাকে। উনি জানতে পেরেছেন। উনি উনার কথাগুলো বলেছেন। উনার মনের কথাও আমরা কিছুটা জানতে পেরেছি।”

বিএনপি কি এতে আশাবাদী- প্রশ্ন করা হলে ফখরুল বলেন, “আমি তো বলেছি যে ভাই আমি খুব সন্তুষ্ট নই।”

সেক্ষেত্রে সংলাপে কী অর্জন হয়েছে- সাংবাদিকদের এই প্রশ্নে বিএনপি মহাসচিব কিছুটা বিরক্ত ভঙ্গিতে বলেন, “সব সময় কি সব অর্জন হয় না কি?”

এসময় পাশে থাকা জেএসডি সভাপতি ও ফ্রন্টের মুখপাত্র আ স ম আবদুর রবও বলে ওঠেন, “এক দিনে সব অর্জন হয় না।”

“আমরা ৭ দফা দিয়েছি, মানা না মানার দায়িত্ব সরকারের। আমাদের আন্দোলন চলবে,” বলেই সংবাদ সম্মেলনের ইতি টানেন রব।

ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের বক্তব্যে হতাশার সুর থাকলেও গণভবন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নে আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা আমির হোসেন আমু বলেন, “বরফ গলতে শুরু করেছে।”

নির্বাচন নিয়ে ভিন্ন অবস্থান থেকে আলোচনার জন্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে সংলাপের এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এতদিন আলোচনার প্রস্তাব নাকচ করে আসা শেখ হাসিনা অপ্রত্যাশিতভাবেই তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে সংবিধানসম্মত বিষয়ে আলোচনার জন্য ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের গণভবনে আমন্ত্রণ জানান।

এই সংলাপ শেষে দলের পক্ষে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নিয়ে গণভবনে সাংবাদিকদের সামনে আসেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

তিনি বলেন, “খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী অখণ্ড মনোযোগ দিয়ে সবার কথা শুনেছেন। কারও কারও কথা তিন-চারবার শুনেছেন। কোনো বাধা দেননি, একটুও অধৈর্য হননি।

“আমাদের সিনিয়র নেতারাও কথা বলেছেন। তারা কিছু অভিযোগ করেছেন। আমাদের নেতারা তার জবাব দিয়েছেন।”

নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিয়ে ফ্রন্ট নেতারা কথা বলেছেন জানিয়ে কাদের বলেন, “প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সভা-সমাবেশ, মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। তবে কোনো রাস্তা বন্ধ করে সমাবেশ করতে দেওয়া হবে না। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটা কর্নার ঠিক করে দেওয়া হবে। সেখানে সব দল সভা-সমাবেশ করতে পারবে। বিনিময়ে একটা কিছু টাকা নেওয়া হবে।”

নির্বাচনে বিদেশি পর্যবেক্ষক রাখার বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী একমত হয়েছেন বলে জানান মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

সংলাপে অংশ নেওয়া আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীদের নেতা শ ম রেজাউল করিম সাংবাদিকদের বলেন, “ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারা খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি বিচার বিভাগের বিষয়। আদালতের বাইরে এ বিষয়ে তার কিছু করার নেই।

“ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারা তত্ত্বাবাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সংবিধানে যা আছে সে অনুযায়ীই নির্বাচন হবে। সংবিধানের বাইরে কোনো কিছুই হবে না।”

নির্বাচন পেছানোর কথাও ঐক্যফ্রন্ট নেতারা বলেছিলেন জানিয়ে রেজাউল বলেন, “এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নির্বাচন করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। এ ব্যাপারে কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে। তার সরকারের কিছুই করার নেই।”

সংলাপে থাকা প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, “আলোচনা হয়েছে। সংবিধানের মধ্যেই আমরা কথা বলেছি। সংবিধানের আলোকে আলোচনা হয়েছে। আলোচনা গঠনমূলক হয়েছে।”

আলোচনা কি আজই শেষ, না আরও হবে- প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যে কোনো জায়গায় যে কোনো সময় আলোচনা হতে পারে।”

ওবায়দুল কাদের বলেন, “নেত্রী বলেছেন, আমার দ্বার উন্মুক্ত। যে কোনো সময় আসতে পারেন।”

তারপর কি আবার সংলাপ হবে- এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “তারা (ঐক্যফ্রন্ট) আসলেই হবে। তারা যদি মনে করেন, আশা দরকার। তাহলে আমাদের খবর দিলে আমরা অবশ্যই নেত্রীর পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানাব।”

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পর অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকেও সংলাপে ডেকেছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। শুক্রবার বিকল্প ধারার পর সোমবার জাতীয় পার্টির সঙ্গে বসবেন তিনি। সংলাপের আমন্ত্রণ গেছে বাম গণতান্ত্রিক জোটের কাছেও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *