#  মানুষের দুর্ভোগে অযথা দাম বাড়িয়ে মুনাফা নেয়া অমানবিক : প্রধানমন্ত্রী #  করোনা পরিস্থিতি এখন বেশি ভয়ঙ্কর : মির্জা ফখরুল #  দেশে আরো দুজন করোনায় আক্রান্ত #  নবীগঞ্জে রামদা চাইনিজ কুড়ালসহ ৩ ডাকাত গ্রেফতার #  নবীগঞ্জের শ্রীমতপুর গ্রামে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাড়ীঘরে হামলা #  নবীগঞ্জে ত্রাণবিতরনে উপজেলা প্রশাসনকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আর্থিক সহযোগীতা #  লকডাউনই আমাদেরকে করোনা ভাইরাসের সংক্রমন থেকে রক্ষা করতে পারে : এমপি মজিদ খাঁন #  বানিয়াচংয়ে প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর যৌথঅভিযান ॥ ৭ জনকে অর্থদন্ড #  বানিয়াচংয়ে প্রশাসনের উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ #  করোনা: ক্ষতি পোষাতে তামাকপণ্যের দাম বাড়ান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে আত্মা’র তামাক-কর ও দাম বৃদ্ধি বিষয়ক বাজেট প্রস্তাব #  করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় বানিয়াচংয়ে প্রশাসনের উদ্যোগে এমপি মজিদ খানের ত্রাণ বিতরণ #  আজমিরীগঞ্জে প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে টাস্কফোর্সের অভিযান #  করোনা পরিস্তিতে শাল্লায় চলছে মডেল মসজিদ নির্মান,অনিয়মের অভিযোগ #  করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে শাল্লায় সেনাবাহিনীর টহল #  নবীগঞ্জে করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে এএসপির অভিযান #  বানিয়াচংয়ে করোনা প্রতিরোধে করনীয় বিষয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রচারণা

সালিশ বিচারে ৩০ কোটি টাকারও বেশি লেনদেন:একজন সাদা মনের মানুষের বিদায়

Ahmodul Haq

এম এ মজিদ : কংশধর তরফদারের কথা মনে আছে? এই ভদ্র লোক জীবিত আছেন কিনা জানিনা। জীবিত থাকলে লজ্জা পাওয়ার কথা। মরে গেলে কিছু বলার নাই। হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার ছিলেন। পাখির মতো গুলি করে মানুষ মেরেছেন। হবিগঞ্জবাসী দীর্ঘদিন তাকে ঘৃণার সাথেই মনে রাখবে। সবে মাত্র সাংবাদিকতা পেশায় আমার প্রবেশ। একটি সালিশ বিচারে সৈয়দ আহমদুল হককে বেইজ্জতি করা হয়েছে এমন একটি গুজবে হাজার মানুষ যখন বিক্ষুব্দ ঠিক তখনই পুলিশ সুপার কংশধর তরফদারের নির্দেশে পুলিশ গুলি করে মানুষ মারতে শুরু করে। একে একে ৭ জনকে হত্যা করা হয়। নিহতদের মধ্যে রাকেশ সুত্রধর, জালাল মিয়া, তোতা মিয়া, আব্দুল লতিফ, ছিদ্দিক আলী, আব্দুস ছালাম, আব্দুল আজিজ রয়েছেন। মশাজান থেকে হাসপাতাল, রক্ত আর রক্ত। দেশবাসীর ধারনা ছিল পরের দিন আরও মারাত্বক অঘটন ঘটবে। বিশেষ করে পুলিশের বিরুদ্ধে। শত শত পুলিশ সদর থানা, পুলিশ সুপারের বাসভবন, পুলিশ সুপারের কার্যালয় ঘেরাও করে আছেন নিজেদের ভবনের নিরাপত্তার জন্য। সদর হাসপাতাল থেকে শায়েস্তাগঞ্জ সড়কে লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশ। বিক্ষোভে অংশ নিবেন। অঘটনেও অংশ নেবেন। আমার খুব মনে আছে, সৈয়দ আহমদুল হক শায়েস্তানগর সড়কে আসলেন সকাল ১০টার দিকে। পৌর ভবনের সামনের সড়কে তিনি বসে পড়লেন। পরে একটি বক্তব্য দিলেন। “আমাকে ভালবাসতে গিয়ে যেসব তাজা প্রাণ আজ লাশ তাদের ঋণ আমি পরিশোধ করতে পারব না। রক্তের প্রতিদান দিতে পারব না। শূণ্যতা পূরণ করতে পারব না। আমার কড়জোড় নিবেদন, আপনারা আমাকে আরেকটি বার ভালবাসুন। যা হয়েছে তাতে সবুর করুন। রাস্তা থেকে সরে যান। কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাবেন না। কোনো ভাংচুর, জানমালের ক্ষতি হয় এমন কিছু করবেন না। এটাই হবে আমার প্রতি আপনাদের শেষ ও সর্বোচ্চ ভালবাসা”। বিশ্বাস করুন, যারা লাঠি ফিকল ইট পাথর সাথে নিয়ে এসেছিলেন, তারা তা ফেলে দিয়েছেন। হাজারো মানুষের চোখে শুধু পানি আর পানি। কংশধর তরফদারের মতো হীণ মানুষের কয়েকটি হৃদয় ছাড়া পুলিশের অনেক অফিসারকে আমি অঝোরে কাদতে দেখেছি। বিষয়টা যদি আমরা উল্টো করে দেখি, তাহলে কী হতো। যদি তিনি বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষনা দিতেন, তাহলে কী হতো। আমার তখনও বিশ্বাস ছিল, এখনও বিশ্বাস করি, সৈয়দ আহমদুল হক ভিন্ন কিছু করতে বললে, কয়েক ডজন নয়, কয়েকশত তাজা প্রাণের মৃত্যু ঘটত। যে কেউ তখন বলেছেন, গুলির কোনো পরিস্থিতি ছিল না। তাতে খামখেয়ালীপনার আশ্রয় নেয়া হয়েছে মাত্র।
১৯৪৯ সালে জন্ম নেয়া একটি শিশু লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ের মনিকোঠায় স্থান করে নেবে কে জানত। বরং এটা হয়তো স্বাভাবিক হতো, সৈয়দ পরিবারের শিশুটি কোনো পীর মাশায়েখ হবেন, মাদ্রাসার শিক্ষক হবেন, বড় কোনো আলেম হবেন কিংবা অন্যকিছু। পথটা সেরকমই ছিল। কর্মজীবন শুরু করেন পইল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা দিয়ে। তারপর সরকারের কো-অপারেটিভ বিভাগে চাকুরী। কোনো কিছুই তাকে স্থির রাখতে পারেনি। সচরাচরের চেয়ে ভিন্ন কিছু যার হওয়ার যোগ্যতা আছে তিনি কেন পড়ে থাকবেন সীমিত জায়গা নিয়ে। সরকারী চাকুরী ছেড়ে দিলেন। ১৯৮৩ সালে হলেন পইল ইউপি চেয়ারম্যান। তখনকার ইউপি চেয়ারম্যান মানে অবকাঠামোর উন্নয়ন নয়। সালিশ বিচার। স্বামী স্ত্রীর মনোমালিন্যতার বিচার দিয়ে শুরু, ভাইয়ে ভাইয়ে বিরোধ, প্রতিবেশীর সীমসীমানা নিয়ে বিরোধ, জমির আইল কাটা নিয়ে বিরোধ এসবই ছিল বিচারের আওতায়। সফল ও আস্থার জায়গাটি তৈরী করতে সময় লাগেনি তার। ২৬ বছরের যুবক হয়ে গেলেন সমাজের অপরিহার্য্য। তাকে ছাড়া আর চলে না। ১৯৮৫ সালে হন উপজেলা চেয়ারম্যান। সালিশের পরিধি বাড়ে। বিষয়ও আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে। এবার গ্রামে গ্রামের বিরোধের মিমাংসার মধ্যমনি হন তিনি। হত্যা মামলা থেকে শুরু করে এহেন কোনো বিষয় নেই যা সৈয়দ আহমদুল হকের হাত বেয়ে শেষ হয়নি। আমি ব্যক্তিগতভাবে যতটুকু জানি, ইউপি চেয়ারম্যান থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান এই সময়টুকুতে তিনি পৈত্রিক শত ক্ষের জমি বিক্রি করেছেন। ব্যক্তিগত একাউন্টে তার এক টাকাও নেই। যা আছে তা সব সালিশ বিচারক হিসাবে মধ্যস্থতাকীরা জিম্মাদারের। সালিশ বিচারক হিসাবে অন্তত ৩০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে সৈয়দ আহমদুল হকের মাধ্যমে। এই বিশাল অংকের টাকা আমাদের সমাজে অন্য কারো কাছে নিরাপদ কি না তা সময়েই বলে দেবে। অথচ তার বিরুদ্ধে আমানতের একটি টাকা খেয়ানতের কোনো অভিযোগ নেই। হবিগঞ্জ কেন্দ্রীয় ঈদগাহের সেক্রেটারী ছিলেন তিনি। এই মহামানবের সাথে হাজার হাজার মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক। সাংবাদিক হিসাবে, আইনজীবি হিসাবে আমারও একটা সম্পর্ক ছিল। তার একমাত্র মেয়ে মিলি আমার ইয়ারমেট। নেপাল স্যারের কাছে আমরা প্রাইভেট পড়তাম। সাব কেমন আছেন জানতে চাইলে মাঝে মাঝে মিলি বলতেন, আব্বুর সাথে তো আমাদের খুব কম দেখা হয়, অথচ সাধারণ মানুষের সাথে সৈয়দ আহমদুল হকের বসবাস। সৈয়দ আহমদুল হকের সাথে যে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল, তা টের পেতাম সংসদ নির্বাচনের আগে। নাম বললে হয়তো বিষয়টা ভিন্ন হতে পারে। সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করতে ইচ্ছুক প্রভাবশালী প্রার্থীদের অনেকেই আমাকে পাঠাতেন, সৈয়দ আহমদুল হকের একটি সাক্ষাৎকার নিয়ে আসার জন্য, জানতে চাইতেন, তিনি কি সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করবেন? করলে কোন দল থেকে? কোনো দলের সাথে তিনি কি যোগাযোগ করছেন? তার সাথে কি বড় কোনো দলের শীর্ষ নেতৃত্ব যোগাযোগ করেছেন? এসব অস্বস্থিকর প্রশ্নের জবাব আগেই জানতে চাইতেন বড় বড় প্রার্থীরা। আমি কয়েকবার সাক্ষাৎকার এনেছিও। তিনি কোনো দল থেকে সংসদ নির্বাচন করবেন না। শুনে আশ্বস্থ হতেন প্রার্থীরা। এই মনিষির মৃত্যু হয়েছে, শুক্রবার লক্ষাধিক মানুষের জানাযার মাধ্যমে শেষ বিদায় জানানো হয়েছে। দলমত নির্বিশেষে সকলেই তার জন্য চোখের পানি ফেলেছেন। আমরা গ্রামীণ জনপথের প্রাণ পুরুষ সৈয়দ আহমদুল হকের পরপারে শান্তি কামনা করি।

লেখকঃ আইনজীবি ও সংবাদ কর্মী

০১৭১১-৭৮২২৩২

Print Friendly, PDF & Email