চেঙ্গিস খান থেকে গাদ্দাফী :-এম এ মজিদ

চেঙ্গিস খানের নাম শুনেননি এমন মানুষের সংখ্যা হয়তো হাতে গুনা যাবে। যারা একটু লেখাপড়া করেছেন, মোটামুটি সচেতন তাদের সবাই চেঙ্গিস খানের নাম জানার কথা। আর যারা ইতিহাস নিয়ে পড়ালেখা করেছেন, রাজনৈতিক ইতিহাস যাদের প্রিয়, তাদের কাছে চেঙ্গিস খান এক রহস্য পুরুষ।

প্রথমে চেঙ্গিস খান সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেয়া যাক- চেঙ্গিস খান ছিলেন অতি বদ মেজাজী, প্রতিশোধ পরায়ন, ইসলামের চরম শত্র“দের মধ্যে অন্যতম। তিনি বিশ্বের বেশিরভাগ জায়গায় রাজত্ব করেন। অন্তত ৩০টি দেশ তো হবেই। চীন, কোরিয়া, ইরান, থাইল্যান্ড, বার্মাসহ অনেক দেশ ছিল তার করায়ত্বে। চরম হিংস্র ও একনায়ক চেঙ্গিস খানের সমালোচনা করে কেউ জীবিত রয়েছে, এমন উদাহরণ দেয়া যাবে না।

৯ বছর বয়সে পিতা মারা যাওয়ার পর ১৩ বছর বয়সে তিনি গোত্র প্রধান হন। গোত্রের লোকজন তাকে মানেনি। গলা ধাক্কা দিয়ে তাকে গোত্র থেকে বিদায় করে দেয়া হয়। ২০ বছর বয়সে আবারও গোত্র প্রধান হলেন চেঙ্গিস খান। চেঙ্গিস খানের আসল নাম তেমুজিন বা কঠিন ইস্পাত। তাকে বিশ্ববাসী বলত বিধাতার অভিশাপ।

চেঙ্গিস খান একেকটি মুসলিম সাম্রাজ্য দখল করে শুধু মসজিদের মোয়াজ্জিন ছাড়া সবাইকে হত্যা করত। পরে মোয়াজ্জিন দিয়ে মসজিদে আজান দেওয়াতো। আজান শুনে লুকিয়ে থাকা মুসলমানরা মনে করতো মোঙ্গল সম্রাজ্যের অধিপতি চেঙ্গিস খান চলে গেছে, মুসলমানরা নামাজ পড়তে মসজিদে আসতেন, এই সুযোগে চেঙ্গিস খান অবশিষ্ট মুসলমানদেরকেও হত্যা করত। মুসলিম সাম্রাজ্য ধ্বংস হতে দেখে বৃটেন আমেরিকা আনন্দে বগল বাজাতো।

১২২৭ সালে চেঙ্গিস খানের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর কাহিনীটিও বেশ আলোচিত। যে ব্যক্তি বিশ্বের অর্ধেক শাসন করেছে সেই চেঙ্গিস খান একটি ঘোড়া থেকে পড়ে মারা যায়। তার লাশ নিয়ে হুলিখেলা হতে পারে এমন আশংকায় তার তেলবাজ সভাষদ ছাড়া কেউই জানেনা চেঙ্গিস খানকে কোথায় কবরস্থ করা হয়েছে।

শুধু তাই নয়, যে এলাকায় চেঙ্গিস খানকে সমাহিত করা হয়, সেই এলাকাটি ৮০০ ঘোড়া দিয়ে অনেকবার মাড়ানো হয়, সকল চিহ্ন মুছে ফেলা হয়, যাতে কেউ কখনও বুঝতে না পারে চেঙ্গিস খানকে কোথায় কবরস্থ করা হয়েছে। তার কোনো ছবিও নেই। বিশ্বের অনেক রাজা মহারাজার ক্ষেত্রেও এমনটা হয়েছে। নেতা পাতি নেতাদের আরও করুন পরিনতি ভোগ করতে হয়েছে।
ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের কথাই ধরুন।

দেশ শাসন করতে গিয়ে কত কঠোর ব্যবহার করেছেন তিনি? মুসলিম নাম ধারণ করে সাদ্দাম হোসেন মুসলমানদের মনই জয় করতে পারেননি। নির্বিচারে মানুষ হত্যার জুড়ি ছিল না তার। তারপরও বিশ্বদরবারে সাদ্দাম হোসেন ছিলেন মুসলমানদের আইডল। ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় সাদ্দাম হোসেনের নামে বিশ্বে অন্তত কয়েক হাজার শিশুর নাম রাখা হয় “সাদ্দাম হোসেন”। প্রতাপশালী এই রাজনীতিক আমেরিকার কাছেও আতংকের কারণ ছিলেন। এক পর্যায়ে সাদ্দাম হোসেনকে একটি সুরঙ্গ থেকে উদ্ধার করা হয়।

বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের আনন্দের দিন পবিত্র ঈদুল আযহার দিন সবাইকে কাঁদিয়ে ফাসিতে ঝুলিয়ে শহীদ করা হয় সাদ্দাম হোসেনকে।
প্রায় দুই যুগ যাবত মিশর শাসন করেছেন হোসনি মোবারক।

ছিলেন সামরিক আমলা। তারপর রাজনীতিক। এক নাগারে দুই যুগ মিশর শাসন করেও তার তৃপ্তি মিটেনি। ক্ষুব্দ জনতা তাহরির স্কয়ারে দিনের পর দিন বিক্ষোভ করলেন। অবশেষে হোসনি মোবারকের পদত্যাগ, গ্রেফতার, বিচারের মুখোমুখি। সর্বশেষ একটি হত্যা মামলায় হোসনি মোবারকের যাবজ্জীবন কারাদন্ড। কিডনী অকার্যকর হয়ে ২৫ ফেব্র“য়ারী তিনি মারা যান। মিশরের জামাল আবু নাসেরের শাসনও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।

ইসলাম পন্থীদের হত্যার পর উল্লাস করা ছিল তার স্বভাব। মিশরের ইসলামপন্থীদের নেতা হাসান আল বান্নাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সেই মুসলিম ব্রাদার হুড ৮০ বছর পর ক্ষমতায়। প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মদ মুরসী ব্রাদার হুডের নেতা। তাকেও ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। যে হুসনি মোবারক ৩০ বছরে কয়েকশ মানুষকে হত্যা করেছেন, সেখানে ৩০ দিনে সেনা শাসক সিসি অন্তত ৫ হাজার মিশরীয়কে হত্যা করেছেন।

সামান্য একজন সেনা কর্মকর্তা হিসাবে যোগদানের পর মাত্র কয়েক বছরেই ক্যু করেন মোহাম্মার গাদ্দাফি । সেনা বাহিনীর কর্ণেল হয়েও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, মেজর জেনারেল বা লেঃ জেনারেল কাউকেই তোয়াক্কা করেননি তিনি। কর্ণেল নাম ধারন করেই লিবিয়া শাসন করেছেন দুই যুগের বেশি। ক্ষমতা ছাড়তে নারাজ গাদ্দাফির করুন মৃত্যু সবারই জানা। তার ছেলে মেয়েরা এখন জেল হাজতে বন্দী।

ইতিহাস স্বাক্ষী, যে রাজা বাদশারা অন্যায়ভাবে দেশের মানুষের উপর অত্যাচার নির্যাতন চালিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করেছে তাদের শেষ পরিনতি হয়েছে করুন। আর ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম শিক্ষা হচ্ছে “কেউ ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেনা”। এসব আমাদের দেশের ছোট বড় রাজাদের, সমাজের ক্ষমতাবানদের ক্ষেত্রেও স্মরন রাখার মতো বিষয় হতে পারে।

হবিগঞ্জ ২৭ জুন ২০২০
০১৭১১-৭৮২২৩২

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *