খালেদার আরও ৭ বছর সাজা

ক্ষমতার অপব্যবহার করে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে প্রায় সোয়া ৩ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ চার আসামির সবাইকে সাত বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।

দুর্নীতির আরেক মামলায় রায়ের সামনে খালেদা

ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে বসানো পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের অস্থায়ী এজলাস থেকে বিচারক মো. আখতারুজ্জামান সোমবার এই রায় ঘোষণা করেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে তিনি বলেন, “আসামি বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত ট্রাস্টের মূলে অবৈধভাবে অর্থ সংগ্রহ করেছেন এবং সেটা ব্যয় করেছেন। এটা কাম্য হতে পারে না।”

জিয়া এতিমখানা দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছরের সাজায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আট মাসের মাথায় দ্বিতীয় দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হলেন।

কারা কর্তৃপক্ষ বার বার খালেদাকে আদালত কক্ষে নিতে ব্যর্থ হওয়ায় তার অনুপস্থিতিতেই এ মামলার শেষ দিকের কার্যক্রম চালিয়ে নেয় আদালত। রায়ের সময়ও তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। তার আইনজীবীরাও আসেননি।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে এ মামলার বাদী প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেছেন, “আমরা সর্বোচ্চ সাজা চেয়েছিলাম, তা পেয়েছি।”

আদালতে উপস্থিত না থাকায় আসামিপক্ষের আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া জানা না গেলেও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “নিম্ন আদালতে এখন আর মানুষ ন্যায়বিচার পাচ্ছে না।”

এই রায়ের প্রতিবাদে মঙ্গলবার সারা দেশে জেলা সদর ও মহানগরে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন তিনি।

৭৩ বছর বয়সী খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য কারা তত্ত্বাবধানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (বিএসএমএমইউ) রাখা হয়েছে। সর্বশেষ ৫ সেপ্টেম্বর তিনি আদালতে এসে বলেছিলেন, বিচারক যত খুশি সাজা দিতে পারেন, তিনি আর আসবেন না।

সাত বছর আগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা এ মামলার চার আসামির মধ্যে খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী শুরু থেকেই পলাতক রয়েছেন।

হারিছের তখনকার সহকারী একান্ত সচিব ও বিআইডব্লিউটিএর নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান রায়ের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

বিচারক আখতারুজ্জামান তার ছয় শতাধিক পৃষ্ঠার রায়ের সংক্ষিপ্তসার প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা সময় নিয়ে আদালতে পড়ে শোনান। ১৫টি বিষয় বিবেচনা করে তিনি আসামিদের সবাইকে দোষী সাব্যস্ত করেন।

দুর্নীতির দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন তিনি।

আর খালেদা জিয়াকে দুর্নীতিতে সহযোগিতা করার দায়ে বাকি তিন আসামিকে দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় একই সাজার আদেশ দেন বিচারক।

পাশাপাশি জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে কেনা কাকরাইলের ৪২ কাঠা জমি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে রায়ে।

দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা: কোনো সরকারি কর্মচারী অপরাধমূলক অসদাচরণ সংঘঠন করিলে বা সংঘঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করিলে সাত (০৭) বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডযোগ্য হইবে এবং অপরাধমূলক অসদাচরণ সংশ্লিষ্ট অর্থিক সম্পদ অথবা সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হইবে।

দণ্ডবিধির ১০৯ ধারা: কোনো ব্যক্তি কোনো অপরাধে সহয়তা করিলে যদি সহায়তার ফলে সাহায্যকৃত কার্যটি সম্পাদিত হয় এবং এই বিধিতে অনুরূপ দুস্ককর্মে সহায়তার শাস্তি বিধানার্থে কোন স্পষ্ট বিধান না থাকে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির উক্ত অপরাধের জন্য ব্যবস্থিত শাস্তি বিধান করা হইবে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, “পরবর্তীতে কেউ যাতে এরকম কাজে উৎসাহিত না হন, সেজন্য তাকে (খালেদা জিয়া) কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা দরকার বলে আদালত মনে করে।

“একইভাবে তাকে সহযোগিতা করার জন্য অপর আসামিদের কঠোর সাজা হওয়া দরকার বলে আদালত মনে করে।”

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে এ মামলার বিচার চালানোর সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে আপিল বিভাগে গিয়েছিলেন তার আইনজীবীরা। সোমবার সকাল ৯টার পর আপিল বিভাগ সেই লিভ টু আপিল খারিজ করে দিলে রায় ঘোষণার বাধা কাটে।

কয়েকটি ধার্য তারিখে আসামিপক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন না করায় বিচারক গত ১৮ অক্টোবর এ মামলার বিচারিক কার্যক্রমের সমাপ্তি ঘোষণা করে ২৯ অক্টোবর রায়ের দিন রাখেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *