রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে মিয়ানমার ইতিবাচক : পররাষ্ট্রমন্ত্রী

বাংলা কণ্ঠ রিপোর্ট ॥ প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে মিয়ানমারের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন বলেছেন, সম্প্রতি বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের ত্রিদেশীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে বাংলাদেশের দেয়া প্রস্তাবগুলোতে সব পক্ষ মোটামুটিভাবে একমত হয়েছে। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে মহাসচিব পর্যায়ে ত্রিদেশীয় বৈঠক হবে। এ বৈঠকে বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হবে।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বৈঠকে প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার একটি সংখ্যার কথা জানিয়েছে। এতে হিন্দু সম্প্রদায়কে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। তবে আমরা চাই সংখ্যা যাই হোক না কেন, প্রত্যাবাসন শুরু হোক। মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী একসাথে অনেক রোহিঙ্গাকে পাঠানোর সুযোগ নেই। এটি হবে ধীরে ধীরে।

রোববার রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। মিয়ানমারকে এ পর্যন্ত আট লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা দিয়েছে বাংলাদেশ। যাচাই-বাছাইয়ের পর মিয়ানমার ৪২ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা চূড়ান্ত করে পাঠিয়েছে।

এ দিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে লেখা এক চিঠিতে জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেজ বলেছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য রাখাইন রাজ্যে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে জাতিসঙ্ঘ কর্মতৎপরতা জোরদার করেছে। আন্তর্জাতিক সমর্থনকে সমন্বয় করে এই সঙ্কট নিরসনে বাংলাদেশের পাশে থাকবে জাতিসঙ্ঘ। সঙ্কটের স্থায়ী সমাধানে আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত ও জাতিসঙ্ঘের সংস্থাগুলো অব্যাহতভাবে কাজ করবে।

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানান জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব।

ইংরেজি নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাঠানো চিঠির জবাবে গুতেরেজ এ চিঠি লেখেন। মহাসচিবের কাছে লেখা চিঠিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি ও প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে জাতিসঙ্ঘকে আরো তৎপর হওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি এ ব্যাপারে মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতকে দায়িত্ব দিয়ে রাখাইনে পাঠানোর অনুরোধ জানান।

কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন ও জাতিসঙ্ঘের অঙ্গ সংস্থার বাধার কারণে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে বলে উল্লেখ করে ড. মোমেন বলেন, তাদের ধারণা ছিল ভাসানচর ভেসে যাবে। জলোচ্ছ্বাস বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে চরটি সুরক্ষার জন্য উঁচু বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় আমফানের সময় সেখানে অনেক জেলে পরিবার আশ্রয় নিয়েছিল। তিনি বলেন, ভাসানচরের আয়তন ৪০ বর্গকিলোমিটার, যা সেন্টমার্টিন দ্বীপের চেয়ে ১০ গুণ বড়। প্রায় ২৫ হাজার মানুষ এই চরে কাজকর্ম করে। সেখানে অন্তত ১৪ হাজার মহিষ পালা হয়। পরিস্থিতি ও সুযোগ-সুবিধা দেখে স্থানান্তরিত রোহিঙ্গারাই কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া তাদের আত্মীয়-স্বজনকে ভাসানচরে আসতে উৎসাহিত করছে। এসব তথ্য জাতিসঙ্ঘকে জানানো হয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, উদ্বাস্তুদের সহায়তা করা জাতিসঙ্ঘের ম্যান্ডেটের মধ্যে পড়ে। কোথায় আশ্রয় নিলে উদ্বাস্তুদের সহায়তা করবে, আর কোথায় করবে না- এ ব্যাপারে জাতিসঙ্ঘ বৈষম্য করতে পারে না। স্টাফদের জন্য কক্সবাজারে থাকা-খাওয়ার ভালো ব্যবস্থা আছে বলে জাতিসঙ্ঘের সংস্থাগুলো কুতুপালং ক্যাম্প পছন্দ করে।

ইংরেজি নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে একই সময়ে মিয়ানমারের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক মন্ত্রী কাইয়া টিনের কাছে চিঠি লিখেছিলেন ড. মোমেন। এর জাবাবে মিয়ানমারের মন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০১৭ সালে দু’দেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির ভিত্তিতে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। এ ছাড়া বাংলাদেশসহ সব প্রতিবেশী দেশের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সমস্যা সমাধানে মিয়ানমার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

পাপুলের গ্রেফতার কুয়েতের সাথে সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে না : লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মাদ শহীদুল ইসলাম পাপুলকে কুয়েতে কারাদণ্ড দেয়া সংক্রান্ত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইস্যুটি বাংলাদেশ-কুয়েত সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলবে না। কুয়েতের সাথে বাংলাদেশের কেবল জোরালো কূটনৈতিক সম্পর্কই নয়, সামরিকসহ বিভিন্ন ধরনের সম্পর্ক রয়েছে।

পাপুলের সংসদ সদস্য পদ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না জানতে চাইলে ড. মোমেন বলেন, সরকারিভাবে না জানা পর্যন্ত আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। কুয়েত সরকার আমাদের সরকারিভাবে কিছু জানায়নি। এটা পত্রিকায় দেখেছি। এ ঘটনা শোনার পরপরই কুয়েতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে ফোন করেছি এবং বলেছি, সঠিক তথ্য নিয়ে আসতে। সেগুলো এলে আমরা সংসদে দেবো। তখন সংসদ ব্যবস্থা নেবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, গ্রেফতারের আগে পাপুল কুয়েতে সংসদ সদস্য হিসাবে নন, ব্যবসায়ী হিসেবে অবস্থান করছিলেন। পাপুল কোনো কূটনৈতিক পাসপোর্ট নেননি। ড. মোমেন বলেন, কোনো বাংলাদেশী বিদেশে অপকর্ম করলে আমরা দুঃখ পাই। আবার কেউ ভালো কাজ করলে গর্বিত হই। পাপুল হচ্ছে ওই ব্যক্তিদের একজন যিনি অপকর্ম করেছেন। এটি আমাদের জন্য লজ্জার।

গত ২৮ জানুয়ারি কুয়েতের ফৌজদারি আদালত মানব ও অর্থপাচারের দায়ে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য শহীদুল ইসলাম পাপুলকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন। একই সাথে তাকে ১৯ লাখ কুয়েতি রিয়াল (৫৩ কোটি ১৯ লাখ ৬২ হাজার টাকা) জরিমানা করা হয়েছে। আদালত কুয়েতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা মাজেন আল জারাহকে কারাদণ্ড ও জরিমানা করেছেন।

মানব ও অর্থপাচারের অভিযোগে গত বছর ৬ জুন লক্ষ্মীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র এমপি শহীদ ইসলাম পাপুলকে গ্রেফতার করে কুয়েতের পুলিশ। এরপর থেকে তিনি সে দেশের কারাগারে আটক ছিলেন। ছয় মাস বিচারপ্রক্রিয়া শেষে তাকে এই সাজা দেয়া হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *