শামীম-আইভীর বাকযুদ্ধে না’গঞ্জে নতুন উত্তাপ

বাংলা কণ্ঠ রিপোর্ট ॥ নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে প্রভাবশালী সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান ও সিটি মেয়র ডাক্তার সেলিনা হায়াৎ আইভীর বাগ্যুদ্ধ। দীর্ঘ দিন ধরে চলা এ দুই নেতানেত্রীর পুরনো বিরোধ আবারো সামনে এসেছে। কেউ কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলছেন না। মেয়র আইভী এবার সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন। পাল্টা তার জবাবও দিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতা সেলিম ওসমান।

নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষ বলছে, ওসমান পরিবারের সাথে মেয়র আইভীর দীর্ঘ দিনের বিরোধের কারণে মূলত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। শামীম ওসমানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গেল ডিসেম্বরে নারায়ণগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে একটি সরকারি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় করার অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে দাবি করলেন নারায়ণঞ্জে হার্ট ইনস্টিটিউট নির্মাণের জন্য। মেয়র আইভীও তার সিটি কপোরেশন এলাকায় অনেক উন্নয়ন করেছেন। সাধারণ মানুষ বলছে, মেয়র আইভী যদি তার সাথে একই টেবিলে বসতে পারতেন তা হলে অনেক সমস্যার সমাধান হতো; পাশাপাশি উন্নয়নের সুফল পেত মানুষ।

স্থানীয় সূত্র জানায়, শামীম ওসমান ও মেয়র আইভীর সম্প্রতি নতুন করে বিরোধের সূত্রপাত হয় গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে। ওই দিন আইভী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে শত কোটি টাকা মূল্যের একটি মন্দিরের দেবোত্তর সম্পত্তি দখলের অভিযোগে গণসমাবেশ করেন জেলা হিন্দু সম্প্রদায় লোকজন। মন্দিরের সম্পত্তি দখলের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে এর আগে মহানগর আওয়ামী লীগ সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট খোকন সাহার বিরুদ্ধে মামলা করেন মেয়র আইভী। খোকন সাহা নারায়ণগঞ্জে শামীম ওসমানের লোক হিসেবে পরিচিত। শহরের দেওভোগ এলাকায় অনুষ্ঠিত গণসমাবেশে সংহতি প্রকাশ করে নারায়ণগঞ্জ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ, পূজা উদযাপন পরিষদ।

একই সমাবেশে মেয়র আইভীর বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত মো: শহীদ বাদল । তিনি হিন্দুদের উদ্দেশে বলেন, আপনাদের সাথে আমি ভিপি বাদল আছি। মেয়র কথা বললে ভয় পাবেন না। কেউ যদি দলে থেকে দলের বদনাম করেন, আপনারা তাকে নৌকা মার্কায় ভোট দিবেন না। মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা বলেন, মন্দিরের সম্পত্তি দখলের বিষয়ে কথা বলায় মেয়র আইভী আমার বিরুদ্ধে আইসিটি আইনে মামলা করেছেন। তিনি বলেন, ২৫ বছর ধরে আমি আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি। মেয়র আইভী আপনি কখনো মসজিদ, কখনো মন্দির, আবার কখনো বঙ্গবন্ধুর হাতে উদ্বোধনকৃত স্কুল ভেঙে দেন।
সূত্র জানায়, শামীম ওসমান ও আইভীর বিরোধের দিতীয় ঘটনা হলো গত ১২ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন জুমার নামাজের পর আইভীর বিরুদ্ধে একটি মাদরাসা ও মসজিদ উচ্ছেদ চেষ্টার অভিযোগে বিক্ষোভ সমাবেশ করে ওলামা পরিষদ।

নারায়ণগঞ্জ হেফাজত ইসলামের সাধারণ সম্পাদক মুফতি বশীরউল্লাহ বলেন, ফতুল্লার মাসদাইর কবরস্থানে একটি মাদরাসা ছিল। সেটি সিটি করপোরেশনের মেয়র উচ্ছেদ করে দিয়েছেন। মেয়র আইভী এবার নগরের প্রাণকেন্দ্র চাষাঢ়া বাগ-এ জান্নাত জামে মসজিদ সংলগ্ন মাদরাসা উচ্ছেদে চিঠি দিয়েছেন। মসজিদ ভেঙে দিয়ে তিনি নিচ তলায় মার্কেট করে উপর তলায় মসজিদ করতে চান। সম্পূর্ণ মুসল্লিদের অনুদানে মসজিদটি এখন তিনতলা।

একই দিন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান মেয়র আইভীর দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘তিন-চার দিন যাবত একই মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। নারায়ণগঞ্জ শহরে দেখলাম হুজুররা ক্ষেপছে। আরেক দিন দেখি হিন্দুরা ক্ষেপছে। এখন যদি আমিও কিছু বলি, তাহলে জিনিসটা খারাপ দেখায়। সবই ঠিক হয়ে যাবে ইনশা আল্লাহ। তিনি বলেন, আমাদের সরকারি মেডিক্যাল কলেজ দরকার। বিশ্ববিদ্যালয় চলে এসেছে। কে বিএনপি, কে আওয়ামী লীগ, কে জাতীয় পার্টি তা না দেখে, সবাই যদি একসাথে বসতে পারি, নারায়ণগঞ্জকে ঢাকার চেয়ে ইম্পরটেন্ট শহরে পরিণত করতে পারব’।

উপরোক্ত দু’টি ঘটনার নেপথ্যে শামীম ওসমান রয়েছেন এমনটা মনে করে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে একটি অনুষ্ঠানে ক্ষোভ ঝাড়েন মেয়র আইভী। তিনি বলেন, হিন্দু-মুসলমান ক্ষেপিয়ে মনে করেছে, শামীম ওসমান অনেক বড় গুণ্ডা। না, তিনি প্রকৃত অর্থে একটা ছিঁচকে গুণ্ডা। সাহস নেই। সে সাহস থাকলে আমার সাথে লড়ুক। যদি সৎসাহস থাকে, তাহলে আসুক আমার সাথে।

সেলিম ওসমানকে উদ্দেশ করে বলেন, অন্যের টাকা দান করে দানবীর হয়ে যান। ব্যবসায়ীদের টাকা দান করেন, দানবীর হয়ে যান। যেখানে আছেন সেখানে থাকেন। মোল্লাদের নিয়ে, হিন্দুদের নিয়ে, সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়ে এত বেশি বাড়াবাড়ি কইরেন না।

মেয়র আইভীর বক্তব্যের কোনো জবাব শামীম ওসমান দেননি। তবে তার বড় ভাই সেলিম ওসমান প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ব্যবসায়ী নেতা সেলিম ওসমান বলেন, কারো সম্পর্কে সমালোচনা গঠনমূলক হলে ভালো হয়; কিন্তু মেয়র আমার উন্নয়ন নিয়ে খোঁচা দিয়েছেন। এখন আমরা যদি বলি, সিটি করপোরেশনের উন্নয়নের বেশির ভাগের অংশীদার জাইকা, বিশ্বব্যাংক, ইউএনডিপি। আসলে উন্নয়নটাই বড় কথা। আমার ভালো কাজে যদি কেউ সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় তাহলে সেটি নিয়ে সমালোচনার কিছু নেই। তেমনি আমরাও বিদেশী দাতা সংস্থার অনুদানকে খাটো করে দেখতে পারি না। কারণ আমাদের মূল উদ্দেশ্য উন্নয়ন।

মেয়র আইভী বলেন, ‘বাগে জান্নাত মসজিদ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নিজস্ব জমিতে। আপনি অবৈধভাবে সিটির জায়গায় মসজিদ করে রাখবেন; ওয়াক্ফ করার কি প্রয়োজন নাই? ওয়াক্ফ ছাড়া কি নামাজ হয়। আপনারাই বলেন। ওফাক্ফ ছাড়া আপনারা নামাজ পড়ছেন। আমরা বলেছি, এটাকে বৈধভাবে করে দেই। সেখানে কার বাড়া ভাতে ছাই পড়ল। কেন পানি ঘোলা করা হচ্ছে?’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *