হবিগঞ্জে পর্যটনের ভূ-স্বর্গের ইতিকথা : গোলাম মাওলা রনি

পর্যটন নিয়ে আমার আগ্রহ বেশ পুরনো। কর্মজীবনে যখনই দেশ-বিদেশের কোথাও যাই তখন সুযোগ পেলেই আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখার চেষ্টা করি। বিধাতার অপূর্ব সৃষ্টি কৌশল আমি বুঝতে শিখেছিলাম পৃথিবীর সর্বকালের সেরা তিনজন পর্যটকের ভ্রমণকাহিনী থেকে। হিরোডোটাস, ইবনে বতুতা এবং মার্কো পলো ছাড়াও আরো অনেক পর্যটকের ভ্রমণকাহিনী আমি পড়েছি। সবার ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকে যা জানা যায় তার মোদ্দা কথা হলো, ভ্রমণের মাধ্যমে যা শেখা যায় কিংবা ভ্রমণে যেভাবে অন্তরাত্মায় উপলব্ধি সৃষ্টি হয় তা অন্য কোনোভাবে অর্জিত হয় না। ফলে আমি সব সময় চেষ্টা করি কর্মময় জীবন থেকে কিছুটা সময় বের করে আল্লাহর জমিন দর্শনের জন্য বের হয়ে যেতে।

আল্লাহর অশেষ দয়ায় পৃথিবীর বহু দেশ, বহু শহর, বিখ্যাত সব নদ-নদী, পাহাড়-সমুদ্র, উপকূল এবং জঙ্গলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছি। সত্যি বলতে কী ভ্রমণের জন্য আমার কাছে বাংলাদেশকেই উত্তম মনে হয়। আজ থেকে বিশ-পঁচিশ বছর আগে যখন বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পর্যটনের অবকাঠামো আজকের মতো ছিল না তখন আমি সপরিবারে যেভাবে বের হয়ে পড়তাম অমনটি ইদানীং হয়ে ওঠে না। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বোধ, রাজনৈতিক অবস্থা এবং সারা দেশে চলমান অর্থনৈতিক মন্দার কারণে মনের ওপর বিশাল এক চাপ জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে আছে। ফলে প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও গত এক বছরে কোথাও যাওয়া হয়ে ওঠেনি। কিন্তু ২০২১ সালের ঈদের পর মন আর শান্ত রাখতে পারছিলাম না। পরিবারের সাথে আলাপ করে হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল এলাকায় নির্মিত দ্য পালেস রিসোর্ট নামক অবকাশ কেন্দ্রে বেড়াতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।

ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে প্যালেস সম্পর্কে যা জানা গেল তা হলো, হবিগঞ্জের পাহাড়ি এলাকায় প্রায় আট শত বিঘা জায়গার ওপর দেশী-বিদেশী বিনিয়োগে পাঁচ তারকা মানের অবকাশ যাপন কেন্দ্রটি গড়ে তোলা হয়েছে। আধুনিক পর্যটনের যাবতীয় সুবিধা এবং আবহমান বাংলার প্রকৃতি-পরিবেশ-খাদ্য এবং সেবার সমন্বয় করে প্যালেস রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু লোভনীয় ছবিসহকারে পর্যটক আকর্ষণের জন্য যেসব বিষয়াদি তাদের ওয়েব পেজ এবং ফেসবুক পেজে সন্নিবেশিত করেছে তা দেখলে আকর্ষণ অনুভব করবে না এমন কোনো মানুষ নেই। সুতরাং আমিও আকৃষ্ট হলাম এবং রিসোর্টের জেনারেল ম্যানেজার মি. জোসেফ গোমসের সাথে কথা বলে একটি দুই রুমবিশিষ্ট ভিলায় দুই দিন থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করে পরিবারের চার সদস্য নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

ঢাকা থেকে হবিগঞ্জের বাহুবলে পৌঁছাতে ব্যক্তিগত গাড়িতে সাকুল্যে চার থেকে সাড়ে চার ঘণ্টা সময় লাগে। রাস্তার অবস্থা বেশ ভালো হওয়ার কারণে ভ্রমণের ক্লান্তি তেমন স্পর্শ করে না। অধিকন্তু ভৈরব ব্রিজের এপার-ওপারে বেশ কয়েকটি উন্নতমানের হাইওয়ে রেস্টুরেন্ট ছাড়াও হবিগঞ্জের প্রবেশমুখের হাইওয়েতে অনেক ভালো রেস্টুরেন্ট রয়েছে, যা আপনার ভ্রমণ আনন্দময় এবং উপভোগ্য করে তুলবে।

আজকের নিবন্ধের মূল বিষয়ে যাওয়ার আগে সম্মানিত পর্যটকদের কাছে অতি সংক্ষেপে নিবন্ধের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা আবশ্যক। তা না হলে কেউ কেউ হয়তো বলে ফেলতে পারেন যে, আপনি মিয়া ধনী মানুষ টাকার গরমে পরিবার পরিজন, ড্রাইভার, পিয়ন, বডিগার্ড নিয়ে পাঁচতারা হোটেলে গিয়ে টাকা খরচ করে আবার সেই গল্প আমাদের শোনাতে এসেছেন। দেশে যখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা- লোকজন খাদ্যসঙ্কটে এবং করোনার ভয়ে তটস্থ তখন আপনার আনন্দ করার শখ জাগে এবং সেই আনন্দের গল্পগুজব শোনানোর জন্য আবার সম্পাদকীয় কলাম লিখতে বসেছেন। বেআক্কল কি তেঁতুলগাছে ধরে, না ধইঞ্চাক্ষেতে পাওয়া যায় সেই কথা না লিখে নিজের ভোগবিলাসের কথা শোনাতে এসেছেন!

আপনি যাতে উপরোক্ত কথাগুলো বলতে না পারেন সে জন্য আমি অনুরোধ করব, সামর্থ্য থাকলে একবার হবিগঞ্জ এলাকা ঘুরে আসুন। আপনি যদি সেখানে যান, লক্ষ করবেন যে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের হবিগঞ্জ অংশে দেশের বৃহত্তম ভারী শিল্প-কলকারখানা গড়ে উঠেছে। আকিজ গ্রুপ, যমুনা গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ, সায়হাম গ্রুপসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী গ্রুপগুলো সেখানে বৃহত্তর পরিবেশে যে মানের ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক গড়ে তুলেছে তা বাংলাদেশের অন্য কোথাও নেই। টেক্সাইল, সিরামিক, ডেনিম, স্পিনিংসহ অন্যান্য বৃহত্তর শিল্পপ্রতিষ্ঠান গত পাঁচ বছরে যেভাবে হবিগঞ্জ এলাকায় গড়ে উঠেছে এবং কম করে হলেও ১০-১৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান করেছে তা রীতিমতো বিস্ময়কর।

আমাদের দেশের প্রাচীনতম শিল্প এলাকাগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম এবং খুলনা অন্যতম। চট্টগ্রাম তাদের ঐতিহ্য রক্ষা করে চললেও খুলনার সেই সুদিন নেই। এই দু’টি এলাকা ছাড়াও গত ত্রিশ বছরে সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ প্রভৃতি এলাকায় অসংখ্য ছোট বড় শিল্প-কলকারখানা স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু চা বাগান অধ্যুষিত হবিগঞ্জে মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে বিস্ময়করভাবে যত বড় বড় বিশ্বমানের অত্যাধুনিক শিল্প-কালকারখানা গড়ে উঠেছে তা বাংলাদেশের গত এক শ’ বছরের ইতিহাসে অন্য কোনো এলাকাতে গড়ে ওঠেনি। আর আপনারা শুনে আশ্চর্য হবেন যে, হবিগঞ্জের শিল্পবিপ্লবের পেছনে অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে বাহুবলের দ্য প্যালেস রিসোর্ট নামক পর্যটন কেন্দ্রটি। সুতরাং আপনারা যদি নিবন্ধের পরবর্তী অংশটুকু ধৈর্য নিয়ে পড়েন তাহলে খুব সহজেই বুঝতে পারবেন যে, আমি কেবল নিজের ব্যক্তিগত বিনোদনের কাহিনী শোনানোর জন্য আজকের নিবন্ধ লিখিনি।

দ্য প্যালেস রিসোর্ট ভ্রমণের পর আমার মনে হয়েছে, কোনো শিল্পপতি অথবা ধনাঢ্য ব্যবসায়ী যদি সেখানে কয়েকটি দিন কাটিয়ে আসেন তবে সংশ্লিষ্ট এলাকায় তিনিও বৃহত্তর কিছু করার কথা চিন্তা করবেন। অথবা বাংলাদেশে বিনিয়োগের চিন্তা নিয়ে যেসব বিদেশী বা প্রবাসী বিনিয়োগ বোর্ড নিবন্ধিত হন তারা যদি এই রিসোর্টটিতে বেড়ানোর সুযোগ পান কিংবা সরকারি-বেসরকারি অংশীদাররা যদি তাদের দ্য প্যালেস রিসোর্টে নিয়ে যান তাহলে আমি নিশ্চিত যে তারা হবিগঞ্জের শিল্প এলাকায় বিনিয়োগ না করে ফিরবেন না।

শিল্প উদ্যোক্তাদের মনোভাবের কথা চিন্তা করেই বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের পর্যটন ব্যবস্থা উন্নত করেছে এবং পর্যটন খাতের উন্নয়নের জন্য অকাতরে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করার পাশাপাশি যারা এই খাতের উদ্যোক্তা তাদের নানারূপ প্রণোদনা দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের পর্যটন খাত চরমভাবে অবহেলিত এবং এই খাতে যারা বিনিয়োগ করেছেন তারা যে কতটা ঝক্কি ঝামেলার মধ্যে থাকেন তা কেবল ভুক্তভোগীরাই বলতে পারেন। প্যালেস রিসোর্টের মতো এতটা বৃহত্তর পরিসরে না হলেও সিলেট, শ্রীমঙ্গল ও কক্সবাজার এলাকায় শত কোটি টাকা ব্যয় করে অনেক হোটেল-রিসোর্ট গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু তারা কেউ ভালো না থাকলেও প্যালেস কর্তৃপক্ষ কিভাবে ভালোভাবে টিকে রয়েছে সেই কাহিনী বলে আজকের নিবন্ধের ইতি টানব।

প্যালেসে ঢোকার পর মনে হয়েছে, তারা তাদের আটশ’ বিঘা জমির প্রতিটি ইঞ্চি সুপরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করেছে। পুরো চত্বরকে স্বপ্নময় মনোহর এবং আরামদায়ক করার জন্য তারা সম্ভবত পৃথিবীর সেরা ডিজাইনারদের সহযোগিতা নিয়েছে। ফলে আট শ’ বিঘার উঁচুনিচু পাহাড়ের প্রতিটি ঢাল, বাঁক সমভূমি গাছপালা-লতাপাতা, ফুলফল এবং ঘাস দিয়ে এমনিভাবে শোভিত হয়েছে, যা দেখলে পৃথিবীর সবচেয়ে রাগী জেদি অসামাজিক এবং অসুখী মানুষটিও মনের অজান্তে বলে ফেলবে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ! পুরো এলাকাকে স্বপ্নময় করার জন্য তারা যেভাবে অভ্যন্তরীণ রাস্তাঘাট নির্মাণ করেছে এবং বাহারি রঙের বাতি দিয়ে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করেছে তা আপনাকে একধরনের নস্টালজিয়ার মধ্যে ফেলে দেবে। পুরো চত্বরে তারা যেভাবে ডলবি প্রো লজিক সারাউন্ড সাউন্ড সিস্টেম স্থাপন করেছে এবং বিশ্বের সবচেয়ে দামি বস কোম্পানির ইকুইপমেন্ট দ্বারা যেভাবে সজ্জিত করেছে তাতে আপনি ফুরফুরে পাহাড়ি হাওয়া, জানা অজানা নানা ফুলের মধুগন্ধ, পূর্ণিমায় অবারিত জোছনার ঢল, পাখির কূজন এবং যন্ত্রসঙ্গীতের এক অপূর্ব সম্মিলনে দেহমন জুড়িয়ে আসতে পারবেন।

প্যালেস কর্তৃপক্ষ তাদের রিসোর্টে অত্যাধুনিক পাঁচতারা মানের ভবন, ভিলা, সিনেপ্লেক্স, ওয়াটার ওয়ার্ল্ড, সুইমিংপুল, স্টিম সনার, রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে ইত্যাদি দিয়ে যেভাবে শিল্পসম্মত উপায়ে নির্মাণ করছে এবং অতীব যত্নসহকারে পরিচর্যা করছে তা দেখে আমার মনে হয়েছে, ওখানে কর্মরত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর আত্মার সাথে রিসোর্টের প্রতিটি ইট-পাথর, বালি, বৃক্ষ-লতা-ঘাস এবং যন্ত্রপাতির এক মায়াময় নিবিড় সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। ফলে আপনি তাদের প্রবেশ পথ থেকে শুরু করে সর্বত্র একই ধরনের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা দেখতে পাবেন। সেখানে ঢোকার পর আমি বারবার শুধু উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা, সাহস এবং ঝুঁকি নেয়ার সক্ষমতা নিয়ে ভেবেছি। কারণ মূল সড়ক থেকে প্রায় চার-পাঁচ কিলোমিটার ভেতরে গহিন জঙ্গলে আবৃত ছোট ছোট টিলা, যা পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল, সেখানে শত শত কোটি টাকা খরচ করে পর্যটনের একটি স্বর্গোদ্যান তৈরি করা যে কত কঠিন সাধনার বিষয় তার কূলকিনারা করার মতো বুদ্ধিসুদ্ধি আমার নেই।

দ্য প্যালেস রিসোর্টের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পত্তি হলো সেখানকার জনশক্তি। প্রায় চার শ’ লোক সেখানে কর্মরত। বেশির ভাগ স্টাফ বিভিন্ন দেশের পাঁচতারা হোটেল রিসোর্টে চাকরি করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। ফলে আপনি গেটের দারোয়ান, নিরাপত্তাকর্মী, রেস্টুরেন্টের শেফ, ওয়েটার থেকে শুরু করে রুম বয়, সার্ভিস বয় এবং ম্যানেজমেন্টের কর্মকর্তাদের মধ্যে আন্তর্জাতিক মানের বিনয়, ভদ্রতা এবং সেবা প্রদানের মানসিকতা দেখতে পাবেন। আপনার রুচি, প্রয়োজন, সুবিধা অসুবিধাগুলো তারা এতটা আন্তরিকতা ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সামাল দেয়ার চেষ্টা করে, যা আমি সচরাচর দেশ-বিদেশের খুব অল্প জায়গায় দেখেছি।

উল্লিখিত সুযোগ সুবিধা সম্বলিত রিসোর্টটি চালু হয়েছে সাত আট বছর আগে। ধারণা করছি তারা হয়তো আরো চার পাঁচ বছর আগে থেকেই ওটির নির্মাণকাজ চালিয়েছে। তো যখন রিসোর্টটি চালু হলো তখন হবিগঞ্জে শিল্পায়ন শুরু হয়নি। দেশ-বিদেশের উদ্যোক্তারা প্যালেসে বেড়াতে যাওয়ার সুবাদে যখন জানতে পারল যে সেখানে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ রয়েছে এবং জমির দামও তুলনামূলক সস্তা তখন অনেকেই ঝড়ের গতিতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় শিল্প-কলকারখানা স্থাপন শুরু করে দেয়, যা এখন রীতিমতো বিস্ময়কর উদাহরণে পরিণত হয়েছে। সুতরাং হবিগঞ্জের দ্য প্যালেসের মতো দেশের অন্য এলাকাগুলোতে যদি পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ করা যায় তবে অদূর ভবিষ্যতে আমরা হয়তো নিত্যনতুন শিল্পাঞ্চল দেখতে পাবো, যা আমাদের অর্থনীতির চাকা বেগবান করবে।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য

 

 

সংগ্রহ দৈনিক নয়াদিগনত্ম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *