বাংলাদেশে বয়স্করা করোনায় বেশি ঝুঁকিতে

বাংলা কণ্ঠ ডেস্ক রিপোর্টঃ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭.৫ শতাংশ ৬০ বছর বা তার চেয়ে বেশি, ফলে কোমরবিডিটি এবং দুর্বল ইমিউনের কারণে করোনা আক্রান্ত বয়স্কদের মধ্যে ৮০ শতাংশের মৃত্যু হচ্ছে।

তারা বলছেন, সরকার ৭ আগস্ট থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে কমপক্ষে এক কোটি মানুষকে টিকা দেয়ার জন্য একটি বিশেষ কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে। দেশে ক্রমবর্ধমান কোভিডে মৃত্যুর হার কমাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বয়স্ক নাগরিকদের টিকা দেয়ার কৌশল নেয়া উচিত।

বিশ্লেষকরা বলেন, বয়স্ক ব্যক্তিদের বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে টিকা নিশ্চিত করার জন্য কমিউনিটি এনগেজমেন্ট এবং ভ্রাম্যমাণ ভ্যাকসিনেশন টিম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বয়স্করা টিকা সম্পর্কে কম সচেতন। এছাড়া তাদের মধ্যে অনেকেই অসুস্থ এবং টিকা কেন্দ্রে যেতে অক্ষম।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক রোববার বলেছেন, ৭ থেকে ১৪ আগস্ট এই সাত দিনে উৎসবমুখর পরিবেশে দেশের মানুষকে কমপক্ষে এক কোটি টিকা দেয়া হবে।

কম সংক্রমণ, উচ্চ মৃত্যুহার

ইউএনবির সাথে আলাপকালে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র রোবেদ আমিন বলেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু এই গ্রুপে মৃত্যুর হার অনেক বেশি কারণ তাদের অনেকে বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছেন।

তিনি বলেন, ‘বয়স্ক নাগরিকদের বেশিরভাগই তরুণদের দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে এবং তাদের ৮০ শতাংশ ভাইরাস সংক্রমণে মারা যাচ্ছে। আমাদের তথ্য অনুসারে, দেশে প্রায় ৮০ শতাংশ কোভিডের মৃত্যু ৬০ বা তার বেশি বয়সের লোকদের মধ্যে রয়েছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যা বিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে এম নূর উন নবী বলেন, ‘৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণরা দেশের মোট জনসংখ্যার ৭. ৫ শতাংশ (১২.৫ মিলিয়ন)। বয়স্ক ব্যক্তিরা সাধারণত যে কোনো রোগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল রোগে ভোগে। তাই, সারা বিশ্বে বয়স্ক কোভিড-১৯ রোগীদের মৃত্যুর হার খুব বেশি।’

টিকাদানে অগ্রাধিকার

ডা. রোবেদ বলেন, আসন্ন গণটিকা কর্মসূচিতে সরকার বয়স্ক নাগরিকদের অগ্রাধিকার দেবে।

তিনি বলেন, প্রতিটি টিকা কেন্দ্রে পুরুষ ও মহিলা বয়স্কদের জন্য আলাদা সারি থাকবে।

রোবেদ বলেন, ‘বয়স্ক নাগরিকরা শুধুমাত্র এনআইডি কার্ড দেখিয়ে ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে পারবে। যাদের এনআইডি কার্ড নেই তারা অন্যান্য নির্ভরযোগ্য ডকুমেন্ট যেমন পাসপোর্ট, জন্মসনদ বা জনপ্রতিনিধিদের অন্যান্য সার্টিফিকেট দেখিয়ে ভ্যাকসিন নিতে পারবে।’

তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয় যাতে বয়স্করা সহজেই কোনো রকম ঝামেলা ছাড়াই টিকা গ্রহণ করতে পারে। যদি আমরা সফলভাবে বয়স্ক নাগরিকদের ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে পারি, তাহলে কোভিডের মৃত্যুর হার পরবর্তীতে হ্রাস পাবে।’

টিকা বৈষম্য

হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘বিশ্বের সব দেশই বয়স্ক নাগরিকদের প্রথমে টিকা দিচ্ছে কারণ তারা কোভিড-১৯ এর জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক যে আমাদের বয়স্ক ব্যক্তিদের গণটিকা কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়নি।’

তিনি বলেন, অনলাইন রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ার কারণে ভ্যাকসিন বিতরণে এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে, যা অনেক বয়স্ক মানুষকে টিকা দেয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে। আমরা জানি বয়স্ক ব্যক্তিদের কিছু ধরণের টেকনোফোবিয়া এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে অনীহা রয়েছে। তাই, অনেক বয়স্ক ব্যক্তি সুরক্ষা অ্যাপ ব্যবহার করে ভ্যাকসিনের জন্য নিবন্ধন করতে পারেন নি। কেবলমাত্র কিছু শিক্ষিত এবং শহরের প্রবীণ নাগরিকই এখন পর্যন্ত টিকা পেয়েছেন।

ভ্যাকসিনের জন্য নিবন্ধনের শর্ত শিথিল করায় সরকারের পদক্ষেপের প্রশংসা করে ডা. লেনিন বলেন, এটি নিশ্চিত করতে হবে যে বয়স্কদের দীর্ঘ সময় ধরে সারিতে অপেক্ষা করতে হবে না কারণ তাদের বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা মুজাহেরুল হক বলেন, ‘বয়স্ক নাগরিকরা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর জটিল অবস্থার সম্মুখীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। কারণ তাদের অনেকের লিভার, ফুসফুস, কিডনি, হার্টের সমস্যা এবং ডায়াবেটিসসহ স্বাস্থ্য সংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে এই গোষ্ঠীর মানুষের মৃত্যুর হার অনেক বেশি।’

তিনি বলেন, ‘ডব্লিউএইচওর নির্দেশনা অনুযায়ী ফ্রন্টলাইনার বা যারা ভ্যাকসিন প্রদানের ক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যবস্থার সাথে জড়িত তাদের পর বয়স্ক ব্যক্তিদের দ্বিতীয় সর্বাধিক অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। কিন্তু আমাদের সরকার তা অনুসরণ করেনি। বরং, টিকা দেয়ার বয়সসীমা কমিয়ে ১৮ বছর করেছে। আমি মনে করি এই ধরনের পদ্ধতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ’

ভ্রাম্যমাণ টিম গঠন

লেনিন বলেন, সরকারের উচিত প্রত্যেকটি ওয়ার্ড বা ইউনিয়নে একটি ভ্রাম্যমাণ টিম গঠন করা।

তিনি বলেন, ‘আমাদের আগের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি অনেক বয়স্ক মানুষ অনেক কারণে ভ্যাকসিন কেন্দ্রে আসতে পারেনি। তাদের অনেকেই শয্যাশায়ী বা তাদের কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার কেউ নেই। সুতরাং, ভ্রাম্যমাণ টিম তাদের বাড়িতে টিকা দিতে পারে।’

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ভ্রাম্যমাণ টিম গঠন না করলে অনেক বয়স্করা ভ্যাকসিন আওতার বাইরে থাকবে। তাই, বয়স্কদের জন্য টিকা নিশ্চিত করার জন্য একটি সুচিন্তিত কৌশল প্রয়োজন।’

সূত্র : বাসস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *